
সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা :
বর্ষার প্রলম্বিত পর্যায় শরৎ বিদায় নিয়েছে। পেঁজা পেঁজা মেঘ ভেসে বেড়ানো ঝলমলে আকাশের গায়ে এসে লাগতে শুরু করেছে কুয়াশার মলিন স্পর্শ। শুরু হয়েছে হেমন্তকাল। দিন ছোট হয়ে আসছে। বেলা পড়ে আসতেই সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে দ্রুত। রোদের তেজ কমে এসেছে। সাধারণত শহরাঞ্চলে হেমন্তের প্রকৃতি ঠিক আপন বৈশিষ্ট্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। তবে জেলা শহরের বাহিরে গ্রামাঞ্চলে হেমন্ত ছাপিয়ে এখনই গাঢ় হতে শুরু করেছে শীতের আমেজ। সাধারণত প্রতি বছর নেত্রকোনায় শীত খানিকটা আগেই নামে। বিশেষ করে মেঘালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকায় শীতের তীব্রতা থাকে সবচেয়ে বেশি। এবার নেত্রকোনায় আগে থেকেই শীত অনুভব করা যাচ্ছে। নিসর্গের কবি জীবনানন্দ দাশ ‘পেঁচা’ কবিতায় হিম হিম হেমন্তের এমনই এক ছবি এঁকেছিলেন। তিনি লেখেন, ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে,-/হেমন্তের মাঠে–মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল;/অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে/হিম হয়ে আসে/বাঁশ–পাতা মরা ঘাস- আকাশের তারা! বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা। এখন কার্তিকের মাঝামাঝি। অগ্রহায়ণের ঢের বাকি। তবুও কেউ চাইলে জীবনানন্দের কবিতার এই লাইনগুলো নেত্রকোনা জেলার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। শীতের হাওয়ায় কাঁপন না লাগলেও এখন থেকেই নেত্রকোনায় রাতের তাপমাত্রা কমে আসছে। মধ্যরাতে হালকা ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। ভোরে হালকা কিংবা ভারি কুয়াশায় ভিজে যাচ্ছে চরাচর।
এ ছাড়া, নেত্রকোনায় অনেক জনপদের মাঠে মাঠে এখন ছড়িয়ে পড়েছে পাকা ধানের ম–ম গন্ধ। কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হবে ধান কাটার ধুম। কৃষকের আঙিনা ভরে উঠবে নতুন ধানে। পাশাপাশি চলছে শীতকালীন সবজি আবাদের কাজ। প্রকৃতির নিয়মে পালা বদল করে এক ঋতু যায় আরেকটি আসে। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে ধীর পায়ে প্রকৃতিতে এসেছে হেমন্ত। তাই তো একে বলা হয় শীতের বাহন। পঞ্জিকার পাতায় হেমন্তের শুরু থেকে প্রকৃতিতে অনুভূত হচ্ছে ঈষত শীতের আমেজ। চারদিকে কুয়াশার মৃদু আবরণ আর নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ জানান দিচ্ছে হেমন্তের উপস্থিতি। শরৎ-এর শেষে হেমন্তের আগমন। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জুড়েই বাংলাদেশে হেমন্তের বিস্তৃতি। শরতের কাশফুল মাটিতে নুইয়ে পড়ার পরপরই বাংলার রূপবৈচিত্র্যে হাজির হয়েছে হেমন্ত।বসন্তের মতো তার নিজস্ব কোনো বর্ণ গন্ধ কিংবা গরিমা নেই। হেমন্ত মৌন শীতল ও অন্তর্মূখী। হেমন্তে ফোঁটা শিউলী, কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, রাজ অশোক প্রভৃতি ফুলের সৌরভ বাঙ্গালির প্রাণে সঞ্চার করে নতুন আমেজ। ভোরের শিশির ভেজা ঘাসে ছড়িয়ে থাকা মুক্ত দানা আর ফসলের সোনালি সমুদ্র সবমিলিয়ে যেন পূর্ণতা পায় প্রকৃতি। হেমন্তের সকালে শিউলীর সৌরভে বাঙালির প্রাণে আসে উৎসবের আমেজ।
এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস ঘোষণা দিয়েছিলেন। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধানে পাক ধরে। কার্তিকের শেষ দিকে গ্রামের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের গন্ধে মৌ মৌ গন্ধ। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের ষড়ঋতুতে। ঋতুর উপস্থিতিতে ঘটছে তারতম্য। তবে এরই মধ্যে প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে উত্তুরে বাতাসের হালকা কাঁপুনি। যে কাঁপুনি একসময় তীব্র হয়ে জানান দিবে শীতের উপস্থিতি। তবে শহরে এখনও উত্তুরে বাতাসের তীব্র কাঁপুনি না হলেও গ্রামাঞ্চলে কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। হেমন্তে কুয়াশা ভেদ করে লাল আভা বেয়ে পূর্ব আকাশে উঁকি দিতে খানিকটা বেগ পেতে হলেও মায়াবী আলোয় ভরে থাকা চারপাশে সজিবতা ফিরে মনে। দৃষ্টিসীমায় কুয়াশার প্রলেপ জমলেও সূর্যের আলো ফোটার আগেই আড়মোড়া ভেঙে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েন গ্রামের মানুষজন।
অপরদিকে গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে হেমন্ত মানেই নবান্ন উৎসবের আমেজ। হেমন্ত এলেই এই জনপদের মানুষের মাঝে আনন্দ বিরাজ করে। হেমন্তের আগমনে গ্রামের মেঠোপথে সকালে হাঠলেই পা ভিজে যাই শিশির কণাতে। হেমন্তের আগমনে মাঠে মাঠে হেসে উঠে সোনালী ধান। পাকাধানের মৌ মৌ সুমৃষ্ট সুভাসে মুখরিত চারিপাশ। আর কয়দিন পরেই কৃষকের ঘরে ঘরে উঠবে রক্তজলকরা সোনালী আমন ধান আর এই নতুন ধানের চাউল থেকে বাংলার গৃহবধুরা গুরা তৈরী করে নতুন খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরী করবে হরেক রকমের বাঙ্গালী পিঠা-পুলি। আসতে শুরু করবে মেয়ে-জামাই। আসছে শীত, ইতিমধ্যে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। সকালের আকাশ অনেকটাই ঘোলাটে থাকে। শেষরাতের দিকে অথবা খুব সকালে হালকা ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। শেষরাতে একটা কিছু গায়ে না জড়িয়ে আরামে ঘুমানো যাচ্ছে না। উষ্ণতম এলাকা নেত্রকোনাতে এমন অবস্থা।