
এ কে এম নাজিম হোসেনঃ ইতিহাসের কিছু মোড় থাকে যা কোনো দিন ম্লান হয় না, কিছু কণ্ঠস্বর থাকে যা শতাব্দীর সীমানা পেরিয়েও কোটি মানুষের হৃদয়ে অবিরাম অনুরণিত হয়। তেমনি এক অবিনাশী মহাকাব্যের নাম আমাদের মহান স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যখনই একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখনই বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে ধেয়ে আসা মুক্তিকামী মানুষের স্লোগান কানে বাজে, তখনই বিনম্র শ্রদ্ধা ও সম্মানে মাথা নুয়ে আসে সেই মহামানবের প্রতি, যিনি একটি পরাধীন জাতিকে দেখিয়েছিলেন মুক্তির চরম স্বপ্ন।
আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, যাঁরা জীবনের সেরা সময়টাকে বাজি রেখে, ঘর-সংসার ও প্রিয়জনের মায়া ত্যাগ করে বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতিতে আজও একাত্তর এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। আজও যখন কোনো বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন, তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ায়। সেই অশ্রু কোনো পরাজয়ের নয়, সেই অশ্রু চরম আত্মত্যাগ আর পরম প্রাপ্তির। মুক্তিযোদ্ধারা আজও চোখ বন্ধ করলে শুনতে পান সেই বজ্রকণ্ঠ—”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই একটি মাত্র আহ্বান কীভাবে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল, কীভাবে সাধারণ কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিল অস্ত্র, তা ভাবলে আজও হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে।
জাতির পিতার প্রতি আমাদের এই আবেগ কেবল অতীতের কোনো স্মৃতিকাতরতা নয়, এটি আমাদের জাতীয় বিবেকের এক পরম জাগরণ। তিনি কেবল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডই দিয়ে যাননি, দিয়ে গেছেন আত্মমর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার এক চিরন্তন দর্শন। কিন্তু আজ যখন আমরা পেছনে তাকাই, তখন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি পেরেছি তাঁর স্বপ্নের সেই শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সোনার বাংলা গড়ে তুলতে? রাজনীতির সংকীর্ণ আবর্তে আমরা যেন কখনো সেই মহান ত্যাগের মহিমাকে ভুলে না যাই। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার হাজারো পথ থাকতে পারে, কিন্তু জাতির গৌরব আর স্বাধীনতার মূল ভিত্তিকে শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া আর অন্তরে সেই দেশের নাগরিকত্ব ধারণ করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যারা এ দেশের মাটিতে জন্ম নিয়েও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের অবিনাশী চেতনার বিরোধিতা করে, কিংবা জাতির পিতার সুমহান অবদানকে অসম্মান করে কথা বলে, তারা ভৌগোলিক পরিচয়ে এ দেশের নাগরিক হতে পারে বটে, কিন্তু আত্মিক ও আদর্শিক দিক থেকে কখনোই প্রকৃত বাংলাদেশী হয়ে উঠতে পারে না। যে চেতনা ও ত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্র অর্জিত হয়েছে, সেই মূল ভিত্তিকে অস্বীকার করার অর্থ হলো নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।
একটি মেধাভিত্তিক ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার এই ক্ষণে তরুণ প্রজন্মের কাছে জাতির পিতার জীবন ও আদর্শ এক আলোকবর্তিকা। তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আজ আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। রাজনীতি যখন জনকল্যাণমুখী হয়, যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তখনই কেবল প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হয় সেই মহান নেতার প্রতি।
আসুন, আমরা আমাদের ভেতরের সমস্ত সংকীর্ণতা ও প্রতিহিংসার দেয়াল ভেঙে একাত্তরের সেই মহান ত্যাগের চেতনায় উজ্জীবিত হই। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অক্ষয় স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে, জাতির পিতার লালিত স্বপ্নের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলি যা হবে মেধাভিত্তিক, সহনশীল ও বৈষম্যহীন। ইতিহাসের পাতা থেকে যে সত্য প্রস্ফুটিত হয়েছে, তাকে বুকে ধারণ করেই আমাদের আগামীর পথ চলতে হবে।
লেখক: এ কে এম নাজিম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, একাত্তর পার্টি।