
নরসিংদীর শিবপুরে গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ গ্রহণের সময় গুলিতে আহত হন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ইটভাটা শ্রমিক আলমগীর। এখন পারিবারিকভাবে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে একটি হাত হারানো উপক্রম হয়েছে তার।নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের পাথাইরকোনা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর। ইটভাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। নিজ এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় গত বছর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে তিনি চলে যান নরসিংদীর শিবপুর থানা এলাকায়। সেখানে ইটাখলা মোড়, মুন্সির হাট চরে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন তিনি।
জানা গেছে, নরসিংদীর ইটাখলা মোড় এলাকায় গত বছরের ১৯ জুলাই মাসে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার বারবার সংঘর্ষ হচ্ছিল। এতে বেশ কয়েকজন লোক আহত হন। এদৃশ্য নিজের চোখে দেখার পর সন্ধ্যার দিকে আরো ২০-২৫ জনের সঙ্গে ছাত্র-জনতার পক্ষে আন্দেলনে অংশ নেন আলমগীর। সেদিন রাত ৮টার দিকে আলমগীরের ডান কাঁধে গুলি বিদ্ধ হন। পরে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে শিবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বিবেচনা করে নরসিংদী জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। তবে কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে সেখানেও তাকে ভর্তি করা হয়নি। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করার পরামর্শ দেন। আলমগীরের বড় বোন নাজমা আক্তার বলেন, ‘গুলিতে আহত হওয়ার খবর পেয়ে আমি ও আমার ছেলেরা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভাইকে ভর্তি করি। সেখানে বারবার আমাদের কাছে জানতে চায়, আমার ভাই নরসিংদী কারাগারে হামলা করেছে কিনা। কিন্তু না করার পরও বারবার জিজ্ঞাস করতে থাকায় গ্রেপ্তারের ভয়ে সেখান থেকে আমার ভাই পালিয়ে যায়। আমার আরেক এক ভাইয়ের সহযোগিতায় ২১ জুলাই হাসপাতাল থেকে পালিয়ে লালবাগ থানা এলাকায় ইসলামবাগে ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নেন।
আলমগীর বলেন, ‘ভাইয়ের বাসায় ১২ দিন ছিলাম। সেখানে ভয়ে ভয়ে দিন কেটেছে। কোনো ভালো চিকিৎসা নেওয়া যায়নি। সেখানেও বলা বলি হতে থাকল, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজন লোক ইসলামবাগ এলাকায় থাকে। পরে সেখান থেকে পালিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার পুরুরা এলাকায় বোনের বাসায় আশ্রয় নেই। বেশ কিছুদিন এখানে থাকার পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পরিবর্তন হয়। এরপর থেকেই পরিবেশ অন্য রকম হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। এখনও আমার হাত সম্পূর্ণ সুস্থ না।আলমগীর বলেন, ‘চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো ঋণ করেছি। এখন হাতে আর কোনো টাকা পয়সা নেই। আমার ডাইন হাতটা অবশ হইয়া গেছে, সব সময় চিনচিন করে ব্যাথা করে।’ ঋণ পরিশোধ ও হাতের চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য চান তিনি।
আলমগীরের মা রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে দিন আনে দিন খায়। পুলিশের গুলি খাইয়া ডান হাতটা অবশ হইয়া গেছে। চিকিৎসা করতে তিন লাখ টাকার মতো ঋণ করছে। এই টাকা কিভাবে দিবে এই চিন্তায় সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। তাছাড়া তার হাত অবশ থাকায় কাজও করতে পারে না। আমি মা হিসাবে সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমার ছেলের সংসারডারে বাঁচানোর জন্য।’এবিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, ‘শুনেছি কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের পাথাইরকোনা গ্রামের আলমগীর নরসিংদীর ইটাখলা মোড় এলাকায় পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষে আলমগীরের ডান কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে তার পরিবার খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আলমগীর ছাড়াও কেন্দুয়া উপজেলায় আরো অনেকেই আহত হয়েছেনে। আমরা উপজেলা প্রশাসন আহতদের তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছি।’ আহতরা যাতে সরকারের সহযোগিতা পান তার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।