
নেত্রকোনায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম। চিকিৎসক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাতে-কলমে শিক্ষার ঘাটতি নিয়ে শুধু বই পড়েই চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। নিজস্ব ক্যাম্পাস ও কিছু ক্ষেত্রে আবাসনসুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। যার মধ্যে নিজস্ব ভবন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়া চলছে এই সরকারি মেডিকেল কলেজ। এ ছাড়া নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের।বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজস্ব ভবনে মেডিকেল কলেজ, কলেজের আয়তন, শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষক, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি—এই রকম অনেক বিষয়ে শর্ত আরোপ করা হয়। তবে সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কোনো নীতিমালা বা শর্ত নেই। সরকারে থাকা ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ইচ্ছায় এসব মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সুযোগ–সুবিধা ছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, অবকাঠামো স্থাপন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে এভাবে মেডিকেল কলেজ চালানো কাঙ্ক্ষিত নয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে না পারলে অর্ধশিক্ষিত চিকিৎসক তৈরি হবে। এতে আর যা–ই হোক, মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা পাবে না।
জেলার আধুনিক সদর হাসপাতালে তিনটি কোয়ার্টার মেরামত করে চলছে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম। নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও কিউরেটর মিলে অনুমোদিত পদ ৭৮টি। কর্মরত আছেন ৪৯ জন। অধ্যাপকের ১২টি পদের মধ্যে অধ্যক্ষ ছাড়া বাকি ১১টি পদই শূন্য। চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পুরোনো মেডিকেল কলেজে একেকটি বিভাগে যেখানে একাধিক অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও প্রভাষক ক্লাস নেন; এখানে তেমন সুযোগ নেই। বিশেষ করে ক্লিনিক্যাল ক্লাসে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক বলেন, প্রসূতি বিভাগের পাঁচটি পদের মধ্যে শুধু একজন সহকারী অধ্যাপক আছেন। একইভাবে মেডিসিন বিভাগে পাঁচটি পদের মধ্যে দুজন সহযোগী অধ্যাপক এবং সার্জারি বিভাগে দুজন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত। ওই দু-একজন শিক্ষককেই কয়েকটি ব্যাচের তত্ত্বীয়, ব্যবহারিক, আইটেম পরীক্ষাসহ সবকিছু সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকের ওপর যেমন অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, শিক্ষার্থীরাও নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমবিবিএসে ভর্তির পর প্রথম পর্বের দেড় বছরের মধ্যে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি পড়তে হয়। দ্বিতীয় পর্বে এক বছরে ফার্মাকোলজি ও ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় পর্বে এক বছরের জন্য পড়তে হয় কমিউনিটি মেডিসিন, প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি। চতুর্থ পর্বে ক্লিনিক্যাল বিষয় পড়তে হয়। সেখানে গাইনি, মেডিসিন ও সার্জারি তিনটি প্রধান বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় হাসপাতালে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহারিকভাবে করতে হয়; কিন্তু নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিকে ঘাটতি নিয়েই শিক্ষাজীবন শেষ করতে হচ্ছে। কোনোমতে ব্যবহারিক শিক্ষা চলছে সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালগুলোতে। নেত্রকোনা ১০০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও রোগী কোনোটাই নেই। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবু সাঈদ মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসক না থাকায় গুরুতর রোগী থাকে না। এতে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ খুব কম থাকছে। ভরসা শুধু বইয়ে পড়া বিদ্যায়।
নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজেশ কুমার দাশ বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস হলে অনেক সংকট কেটে যাবে। একটির সঙ্গে অন্যটির সংযোগ আছে। এখানে ক্লিনিক্যাল ক্লাসের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় দ্বিতীয় ব্যাচের ৫০ শিক্ষার্থীকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ কোথায় হবে, কলেজের সঙ্গে যুক্ত থাকা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ কোথায় হবে, সবকিছুই ধোঁয়াশার মধ্যেই আছে। গত বছরের জানুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ একর জায়গা থেকে ৫০ একর জায়গা নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজকে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের বাধায় তা আটকে যায়। এখন পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করা হয়নি। কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, স্থায়ী জায়গা যেহেতু নির্ধারণ হয়নি, তাই যতটুকু পারছেন অল্প পরিসরের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো করে নিচ্ছেন।