
মহুয়া মলুয়ার দেশে সবুজে ঘেরা নেত্রকোণা সরকারি কলেজ নেত্রকোণা জেলার অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জানা যায় দেশ বিভাগ পূর্বকালে এই জেলায় আধুনিক শিক্ষার সূচনা হলেও বৃটিশ শাসন আমলে এখানে কোনো কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে বিদ্যমান স্কুল গুলো থেকে প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী, প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রী বেরিয়ে এলেও বিত্তবান পরিবারের সন্তানেরাই ময়মনসিংহ, ঢাকা বা কলকাতায় গিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতো। আর এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো অসংখ্য গরীব মেধাবী ছাত্রছাত্রী। এ অবস্থায় এলাকার তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। দেশ বিভাগোত্তর কালে নেত্রকোণা মহকুমা প্রশাসক গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ সিএসপি এর আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন আছান আলী এমএলএ, আকবর আলী এমএলএ, এ.কে ফজলুল হক, প্রফুল চৌধুরী, ডাঃ ছমির উদ্দিন ও বীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী (সন্দেশ বাবু)। উদ্যোক্তাদের প্রথম সভাতেই তৎকালীন রৌহার জমিদার বীরেন্দ্র দত্ত চৌধুরী (সন্দেশ বাবু) সাতপাইয়ের যে স্থানে কলেজটির অবস্থান,সে জমিটুকু কলেজের জন্য দান করেন। পরবর্তীকালে নিজস্ব ভূমিতে কলেজের অবকাঠামোর নির্মান কাজ শুরু হলে আরো কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি কলেজের জন্য ভূমি দান করেন।
এ ছাড়া আরো জানা যায় নির্মাণকাজে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন নেত্রকোণা অঞ্চলের কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ। ১৯৪৯ সালে উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ বছরই ছাত্র ভর্তি শুরু হয়। নাম করণ করা হয় ‘‘নেত্রকোণা কলেজ’’। তখন কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রিয়ভূষন বণিক। অধ্যক্ষ সহ ৭ জন শিক্ষক, ১ জন কেরানি, ৩ জন পিয়ন ও স্বল্প সংখ্যক ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘নেত্রকোণা কলেজ’। কলেজর প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হত ‘দত্ত হাই স্কুল’ এর ছাত্রাবাস থেকে। ক্লাস অনুষ্ঠিত হত স্থানীয় ‘আঞ্জুমান হাইস্কুল’ ও ‘ইউ.সি. পাবলিক হল’-এ। পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালে বর্তমান স্থানে নিজস্ব গৃহে কলেজ স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে মানবিক ও বানিজ্য শাখা ছাড়া অন্য কোনো শাখা ছিল না। ১৯৬০-৬১ সালে বিজ্ঞান শাখা খোলা হয়। ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে কলেজটিকে ডিগ্রী কলেজে উন্নীত করা হয়। ১৯৬৫ সালে বি.কম এবং ১৯৬৮ সালে বি.এস.সি কোর্স খোলা হয়। ১৯৮০ সালে কলেজটিকে সরকারীকরণ করা হয়। তখন নামকরণ করা হয় ‘নেত্রকোণা সরকারি কলেজ’। স্বাধীনতাযুদ্ধ সহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে এ কলেজের সুযোগ্য ছাত্র-শিক্ষকগণের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। প্রকৃত অর্থে নেত্রকোণা সরকারি কলেজই হল নেত্রকোণার শিক্ষা-সংস্কৃতি চর্চার এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা তথা নেত্রকোণার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতীক। নেত্রকোণার শিক্ষানুরাগী বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের সমবেত ও সামগ্রিক প্রচেষ্টায় কলেজটি যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজও তাঁদের সার্বিক সহযোগিতায় কলেজটি উত্তরোত্তর উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হচ্ছে।
এদিকে নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজ নেত্রকোণা জেলা শহরে অবস্থিত একটি সরকারি কলেজ। শহরের প্রাণকেন্দ্র মোক্তারপাড়ায় এই কলেজটির অবস্থান। এই কলেজটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ১৯৮৬ সালে সরকারিকরণ করা হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ-এর নারীশিক্ষা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত এই কলেজ অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বিধান চন্দ্র মিত্র বলেন, নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকেই এই কলেজটি সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এবং পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে এই কলেজটিকে তার শিক্ষার মানোন্নয়নের ফলে সরকারিকরণ করা হয়। এবং এখন পর্যন্ত এই কলেজ অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ আবু তাহের খান জানান, হাওর পাহাড় নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীমান্তবর্তী এই নেত্রকোণা জেলার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ নেত্রকোণা সরকারি কলেজ। এই কলেজে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মেধাবী শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতি বছর এই কলেজ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি মেডিকেল কলেজ গুলোতে। অত্র কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত তাদের অর্জিত ফলাফলের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে রাখছে মেধার স্বাক্ষর। এই কলেজের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীরা জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডার পদে, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং জাতি গড়ার মহান পেশা শিক্ষকতায়। শুধু তাই নয় ব্যবসা, বাণিজ্য, রাজনীতি ও সৃজনশীল নানান কর্মেও নিয়োজিত আছে আমাদের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীরা। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেমন কুসংস্কারমুক্ত, বিজ্ঞানমনষ্ক তেমনি তারা সমাজ সচেতন ও মানবিক।