সাংবাদিককে হত্যার হুমকি, বিএনপি নেতা পরিচয়ে চুন্নু—দল বলছে, সাধারণ সদস্যও নন; রহস্য কোথায়?
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোনার আটপাড়ায় দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ইবাদ হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চুন্নু খানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই সাংবাদিক। অভিযোগের পর চুন্নু খান নিজেকে উপজেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দাবি করেন। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেছেন, চুন্নু খানের দলের কোনো পদ নেই, এমনকি তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্যও নন। গত শনিবার চুন্নু খানের সঙ্গে সাংবাদিক ইবাাদ হোসেনের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই কল রেকর্ডে চুন্নু খান ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা সাংবাদিক ইবাদ হোসেনকে অশালীন ভাষায় গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দিতে শোনা গেছে। এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে চুন্নু খানের দাবি, অডিও রেকর্ডটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি কাউকে হুমকি দেননি। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিক ইবাদ হোসেন তাঁর এক আত্মীয়ের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এ নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইলেও ইবাদ রাজি হননি। চুন্নু খান নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় একটি এমপিওভুক্ত নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
অন্যদিকে ইবাদ হোসেন আটপাড়া উপজেলা সদরের পোস্ট অফিস রোড এলাকার বাসিন্দা। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, ‘সাংবাদিক ইবাদকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছি। পরে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। তাঁকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
চুন্নু খানের রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চুন্নু খান দলের কোনো পদে নেই। এমনকি দলের সাধারণ সদস্যপদও তাঁর নেই। বিষয়টি জানতে চাইলে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবির আহাম্মদ বলেন, তিনি এখনো অডিও রেকর্ডটি শোনেননি। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে কারও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ক্যাডারের কাজ, শিক্ষকের নয়। বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটপাড়া উপজেলা সদরের পোস্ট অফিস রোড এলাকায় সাংবাদিক ইবাদ হোসেনসহ ৮ থেকে ১০টি পরিবারের বাড়ি থেকে প্রধান সড়কে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে পরিবারগুলো মিলে চলাচলের জন্য এক শতক জমি কিনে নেয়। সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দুই মাস আগে ওই রাস্তায় ইটের সলিং করে দেয়। সলিং নির্মাণের প্রায় এক মাস পর রাস্তার পাশের জমির মালিক শাহীন সুলতানা সুমি রাস্তাটির জমি নিজেদের বলে দাবি করেন। পরে তাঁর চাচাতো ভাই চুন্নু খানসহ স্থানীয় কয়েকজন রাস্তাটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে রাস্তা ব্যবহারকারী পরিবারগুলো আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত রাস্তাটির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে ওই নিষেধাজ্ঞার পরও চুন্নু খান প্রভাব খাটিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এতে ৮ থেকে ১০টি পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতা চাইলে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তা খুলে দেন।সাংবাদিক ইবাদ হোসেনের অভিযোগ, রাস্তা খুলে দেওয়ার পর থেকেই চুন্নু খান আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছেন। সেইসাথে অশালীন গালাগাল করছেন। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত আমার ছোট ভাই, তাকে যেকোনো মূল্যে চাকরি থেকে অপসারণ এবং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরে (আইএসপিআর) অভিযোগ করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। হুমকির বিষয়টি রেকর্ড রয়েছে আমার কাছে। এসব ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে ২০ অক্টোবর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি।
ইবাদ হোসেন বলেন, ‘প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে আমরা এই রাস্তা ব্যবহার করে আসছি। সাত থেকে আট বছর আগে চলাচলের জন্য এক শতক জমিও কিনেছি। এরপরও রাস্তাটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবাদের প্রতিবেশী কামরুল হাসান রবিন, খায়রুল কবির ও সুমন ভূঁইয়া বলেন, চলাচলের সুবিধার্থে আমরা সবাই মিলে রাস্তার জন্য এক শতক জমি কিনেছি। কিন্তু পাশের জমির মালিক সুমি আক্তারের চাচাতো ভাই চুন্নু খান প্রভাব খাটিয়ে রাস্তাটি দখল করে বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেন। আইনের আশ্রয় নেওয়ায় এখন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা ন্যায় বিচার চাই। এ বিষয়ে চুন্নু খানের দাবি- তিনি ওই কল রেকর্ড এআই দিয়ে বানানো এবং তিনি কোন হুমকি দেননি। সাংবাদিক ইবাদ হোসেন তার আত্মীয়র জমি দখল করে রাস্তা করেছেন। এ নিয়ে আলোচনায় বসার জন্য বলললেও ইবাদ বসেননি। উল্টো মামলা করেছে। একপর্যায়ে নিজেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন- ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তবে উপজেলা বিএনপির সভাপতিমণ্ডলীতে কতজন সদস্য রয়েছেন- এমন প্রশ্ন করার পর তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ বিষয়ে আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জুবায়দুল আলম বলেন, ৮ - ১০টি পরিবারের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর সাংবাদিক ইবাদ হোসেন অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়। হুমকির ঘটনায় সাংবাদিক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শরীফ। নির্বাহী সম্পাদক : তাসেরা তাজরীন। বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ আমান উল্যা।সম্পাদক ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: এমএস প্লাজা (৩য় তলা)২৭/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
তুহিন প্রেস ২১৯/২, ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল হতে মুদ্রিত। ফোন: +৮৮-০২-৪১০৫২৪৯৪, মোবাইল: ০১৯৭১-৮৪২৩৬৫, ০১৭১১৮৪২৩৬৫, বার্তা: ০১৭৩১-৮৫৭১৮৬ ,anantabanglanews24@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক অনন্ত বাংলা. All rights reserved.