প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২, ২০২৬, ৭:৩৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৫, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
দুই উকিলের কাছে জিম্মি পুরো নির্বাচনী এলাকা, দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড়

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ও নেত্রকোনা-৩ (আটপাড়া-কেন্দুয়া) আসনের সাবেক এমপি অসীম কুমার উকিল এবং তার স্ত্রী সাবেক এমপি (সংরক্ষিত আসন) ও যুব মহিলা লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলের কাছে জিম্মি ছিল নির্বাচনী এলাকার মানুষ। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এলাকায় দলীয় পদ বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন) দলীয় প্রতীক পাইয়ে দেওয়া ও প্রভাব কাটিয়ে চেয়ারম্যান-মেয়রদের জিতিয়ে আনার বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন অসীম কুমার উকিল। এছাড়া স্কুল-কলেজের কমিটিতে পদ পদবি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, টিআর, কাবিখাসহ সরকারি বরাদ্দের প্রায় পুরোটাই পকেটে নিয়েছেন এই এমপি। তার এসব কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে বিরোধীদের ধরে এনে নিজের বাসভবনের টর্চার সেলে আটকে করতেন অমানবিক নির্যাতন।এসব নির্যাতন শুধু যে বিএনপিকে করতেন তা নয়, স্বার্থের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ালে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও চালাতে নির্যাতন। অসংখ্য গায়েবি মামলায় বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে জেলে পুরেছেন, অনেককে এলাকা ছাড়া করেছেন এই উকিল দম্পতি। বিরোধী দল দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ব্যবহার করেছেন বেআইনিভাবে। তারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পাদনায় খুলেছিলেন ‘পানকৌড়ি’ নামে একটি অনলাইন নিউজপোর্টাল। এতে সাংবাদিক নিয়োগ দিয়ে সাংবাদিকদের বস হয়ে উঠেছিলেন তারা। সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে এমনটাই জানিয়েছেন তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নেত্রকোনা-৩ আসনে (কেন্দুয়া-আটপাড়া) নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। ছোটবেলা থেকে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে সপরিবারে বসবাস করতেন অসীম কুমার উকিল। তবে কেন্দুয়ার ‘উকিল বাড়ি’ নামে তার একটি প্রসাদসহ বাসভবন রয়েছে। মাঝে মাঝে এখানে আসতেন। নির্বাচনী এলাকায় তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে তার মেলামেশাও ছিল কম। তবুও দলীয় প্রভাবে এমপি নির্বাচিত হন অসীম কুমার উকিল। তার স্ত্রী অপু উকিল নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে কেন্দুয়া-আটপাড়ায় স্থানীয় নির্বাচনে (উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের পাশ করাতেন দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দলীয় পদ বণ্টন করতেন। ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট, সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ ও উন্নয়নের নামে লুটপাট করে দেশে বিদেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। টিআর কাবিখা, সরকারি ভর্তুকির সব প্রকল্পের টাকা সুবিধাভোগীদের না দিয়ে হাতিয়ে নিতেন অপু উকিল।
অসীম কুমার উকিল নামে এমপি থাকলেও স্থানীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন তার স্ত্রী অপু উকিল। দুর্নীতি, লুটপাটের টাকায় ঢাকার উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডে দুই ইউনিটের সাততলা বাড়ি, ধানমণ্ডি ১১ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লটের মালিক হয়েছেন অসীম কুমার উকিল ও অপু উকিল। নেত্রকোনা সদরের কাটলী মৌজায় মূল্যবান জায়গা, কেন্দুয়া পৌরসভার সাউদপাড়ায় রাজকীয় বাড়ি, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের খড়মপট্টিতে উকিল নিবাস নামেও একটি বাড়ি রয়েছে তাদের। এছাড়া দুই ছেলে সায়ক উকিলের নামে কানাডায় ও শুদ্ধ উকিলের নামে লন্ডনে বাড়ি রয়েছে। ভারতের বেঙ্গালুরুতে নামে-বেনামে তাদের বিশাল বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগে জানা যায়। অসীম কুমার উকিলের ভাই অশেষ কুমারের নামে আছে চট্টগ্রামে শিপিং লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা ও শপিংমল। এমপি থাকাকালে ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর অসীম কুমার উকিল ও তার স্ত্রী অপু উকিলের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ থাকার বিষয়ে অভিযোগ করেন নেত্রকোনা জেলা কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি কেশব রঞ্জন সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দুদক বরাবর অভিযোগটি করেন তিনি। তখন কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি আমলে নেয়নি।
ছাত্র-জনতার বিপ্লবে সরকার পতনের পর পালিয়ে গিয়ে ভারতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অসীমকে সস্ত্রীক আড্ডা দিতেও দেখা গেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়েছে। এদিকে গত ৫ আগস্ট কেন্দুয়ায় অসীম কুমার উকিলের বাসভবন ‘উকিল বাড়ি’তে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা। এতে বাসভবনের বেশ ক্ষতি হয়। ভাঙচুর করে টর্চার সেলটিও। দেশের বাইরে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে অসীম কুমার ও তার স্ত্রী অপু উকিলের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে সেই টাকার অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতিদমন কমিশন (দুদক)। তাদের গোটা পরিবারের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভাঙচুর ও নাশকতার অভিযোগে অসীম উকিল ও তার স্ত্রী অপু উকিলের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে থানায় কমপক্ষে তিনটি মামলা হয়েছে। তারা পলাতক থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তানজিলা শাহ রুবি নামে স্থানীয় এক নারী সাংবাদিক জানান, একবার আমি আটপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসে হার্ভেস্টার মেশিনের তথ্য চেয়েছিলাম। পরে অপু উকিল কল দিয়ে আমাকে নানান হুমকি ধমকি দিয়েছে। কেন আমি তথ্য চাইলাম এ জন্য তিনি ক্ষুব্ধ হন। উপজেলার সবকিছু অপু উকিলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তার কাছে সাংবাদিকরাও নিরাপদ ছিল না।
এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ভূইয়া মজনু বলেন, অসীম কুমার উকিল শুধু নামে এমপি ছিল, র্নিবাচনী এলাকা পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করতেন তার স্ত্রী অপু উকিল। দুই উপজেলার উন্নয়নের সব বরাদ্দ লুটপাট করেছেন তারা। দলীয় পদ বাণিজ্য, স্কুল কলেজের কমিটি বাণিজ্য, স্থানীয় নির্বাচনে জনপ্রতিনিধিদের টাকার বিনিময়ে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়াসহ এমন কোনো দুর্নীতি নেই যে তারা করেনি। এসব টাকায় দেশে বিদেশে অঢেল সম্পত্তি গড়েছেন। তাদের উকিল বাড়িটা ছিল টর্চার সেল। কেউ তাদের বিরোধিতা করলেই ধরে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করতেন। এমনকি নিজের দল আওয়ামী লীগের কেউ বিরোধিতা করলেও তাদেরকেও ধরে নিয়ে টর্চার করতেন। নিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য গায়েবি মামলা দিয়েছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে পাঠিয়েছে। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও কেন্দুয়া উপজেলার বাসিন্দা ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, ওই আমলে আমার আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় আসার আগেই নতুন আরেকটা মামলা দিয়েছে। এভাবে অসংখ্য গায়েবি মামলা দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করে রেখেছে। জেলে পাঠিয়েছে শত শত নেতাকর্মীকে। অসীম কুমার উকিল এলাকায় বেশি থাকতো না। ক্যাডার বাহিনী গঠন করে পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করতো অপু উকিল। বিগত ১৫ বছর দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের পদ পেতে ও স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসার কমিটিতে পদ পদবি পেতে হলে অপু উকিলকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো। উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রতীক পাইয়ে দেওয়াসহ প্রভাব খাটিয়ে তাদের জিতিয়ে আনার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন অপু উকিল। সরকারি যত উন্নয়ন বরাদ্দ আছে সবগুলোর টাকা কাজ করার আগেই নিয়ে নিতেন। কৃষি অফিসের ভর্তুকির হার্ভেস্টার বিক্রি করতেন টাকার বিনিময়ে। সব লুটে দেশে বিদেশে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। এসবের অভিযোগ তাদের দলের নেতাকর্মীরাই করেছেন বিভিন্ন সময়ে। তাদের সম্পদ জব্দ করার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থান নেওয়ার দাবি জানান তিনি। উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টুর কাছে হেরে যান অসীম কুমার উকিল। ব্যাপক দুর্নীতির কারণে এই হার বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শরীফ। নির্বাহী সম্পাদক : তাসেরা তাজরীন। বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ আমান উল্যা।সম্পাদক ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: এমএস প্লাজা (৩য় তলা)২৭/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
তুহিন
প্রেস ২১৯/২, ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল হতে মুদ্রিত। ফোন:
+৮৮-০২-৪১০৫২৪৯৪, মোবাইল: ০১৯৭১-৮৪২৩৬৫, ০১৭১১৮৪২৩৬৫, বার্তা: ০১৭৩১-৮৫৭১৮৬
,anantabanglanews24@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক অনন্ত বাংলা. All rights reserved.